নগরের টাইগারপাসে দেশের একমাত্র দ্বিতল সড়কের উপর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিল ও সিডিএ কর্তৃক এই বিষয়ক সুষ্পষ্ট ঘোষণা এবং চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী, খাল, জলাশয়, বন, মাঠ, জীববৈচিত্র, প্রাণ-প্রকৃতি, ন্যাচারাল হেরিটেজ সুরক্ষা ও শহরের সবুজ বেষ্টিত অঞ্চলকে গ্রীন জোন ঘোষণার দাবীতে নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
 |
নগরের সবুজ বেষ্টিত অঞ্চলকে গ্রীন জোন ঘোষণার দাবীতে নাগরিক সমাবেশ।
|
শনিবার (২৭ এপ্রিল) চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস মোড়ে সম্মিলিত পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের ব্যানারে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজনে তিন শতাধিক নগরবাসীর উপস্থিতিতে সংগঠনের দাবীসমূহ ও ভবিষ্যত কর্মপন্থা ঘোষণা করেন সংগঠন।
সংগঠক ডা. মো. মনজুরুল করিম বিপ্লব এর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন পরিবেশবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর শফিক হায়দার, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর সিকান্দার খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার সুভাষ বড়ুয়া, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর ইমরান বিন ইউনুস, নাট্যজন ও লেখক শিশির দত্ত, বিশিষ্ট আলোকচিত্রশিল্পী মইনুল আলম, উন্নয়ন ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব কমল সেনগুপ্ত, চট্টগ্রাম বার এসোসিয়েশনের এডভোকেট আনোয়ার হোসেন আজাদ, মুক্তিযোদ্ধা ও নদী গবেষক প্রফেসর ইদ্রিস আলী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়- ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক নাসরীন আকতার,চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ নেতা এম কাইছার উদ্দীন।
 |
| সভা শেষে প্রতিবাদ মিছিল |
এসময় প্রফেসর ইদ্রিস আলী বলেন, যারা পরিবেশকে নিয়ে ব্যবসা করতে চায় তাদেরকে প্রতিহত করার সময় হয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীকে অন্ধকারে রেখে যারা সিআরবিতে হাসপাতাল করতে চেয়েছিল সেই শক্তি এবার নগরের ফুসফুস ক্ষত করে র্যাম্প করতে চাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ মানে স্মাট পরিবেশ, স্মাট মানুষ হতে হবে। অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা কি তা আমরা কোভিডকালীন সময়ে দেখেছি। কাজেই গাছ কাটতে দেওয়া যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির একজন প্রতিনিধি হিসেবে বলছি, এক শ্রেণির শকুন ব্যবসায়ী পরিবেশকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে, তাদের হাত থেকে নগরকে রক্ষা করতে হবে।
সম্মিলিত পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সংগঠক ও অগ্নিবীণা পাঠাগারের প্রতিনিধি জাহেদুল আলম বলেন, নিজেদের প্রয়োজনে আমাদের আজ মাঠে নামতে শুরু করেছে। আজ যে জলবায়ুর পরিবর্তন হয়েছে এর পেছনে দায় কারা? এভাবে যদি দিনেদিনে পরিবেশ ধ্বংস হয় তবে ভবিষ্যত প্রজন্মকে জবাব দেওয়ার কিছু থাকবে না।
তিনি আরো বলেন, গাছ কাটলে শুধু অক্সিজেন আসা বন্ধ হবে তা না, সাথে পাখি সহ নানা প্রাণীর আবাস ও খাবার নষ্ট হবে। এমন সর্বনাশা ঝুঁকি নেবার কোনো দরকার আছে বলে মনে হয়না।
প্রফেসর শফিক হায়দার বলেন, আমরা পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ করেছিলাম। এরমতো করে র্যাম্প নির্মাণ প্রকল্পকে বাতিল করে ঘরে ফিরতে হবে।
এছাড়া উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন প্রফেসর ড. এম. এ গফুর, নারীনেত্রী হাসিনা আকতার টুনু, উন্নয়ন সংগঠক উৎপল বড়ুয়া, বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা পরিষদের মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) জসীম উদ্দিন, এম. শাহাদাৎ নবী খোকা ও জাফর আল তানিয়া।
সম্মিলিত পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের দাবীর পক্ষে উপস্থিত হয়ে যেসব ব্যক্তি ও সংগঠন সংহতি জানিয়েছেন তা হলো, হক ফাউন্ডেশন, ব্রাইট বাংলাদেশ ফোরাম, ঊষা নারী উন্নয়ন সংস্থা, বুরো বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংগঠন, নারী ঐক্য বাংলাদেশ, সংশপ্তক, বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন, এইচ ফাউন্ডেশন, শহীদ স্মৃতি পাঠাগার, ফার্মাসিউটিক্যাল পরিবেশ ফোরাম, বাইকার নজরুল ইসলাম ও একশন ফর ইয়ুথ ক্লাব। সমাবেশ সঞ্চালনা করেন মাহমুদুল আলম সৈকত এবং সম্মিলিত পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন, চট্টগ্রাম এর সংগঠকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাশেদ সুফিয়ান, সৌরভ চৌধুরী, জাহেদুল আলম, সোহাইল উদ দোজা ও তোফাজ্জেল অভি।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, এই স্পটে র্যাম্পের কোন প্রয়োজনই নেই। যেখানে ৯৮% মানুষ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারই করতে পারবে না সেক্ষেত্রে তাদের টেক্স এর টাকায় এটি বানোনো হচ্ছে। শতশত মানুষ আজ একত্র হয়েছে টাইগারপাসের দ্বিতল সড়কের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের বিপক্ষে। একটি গাছ কাটলে শুধু ওই গাছের প্রাণ নয় সে সাথে অনেক কিছুর মৃত্যু ঘটে, যেকোন মূল্যে পরিবেশ বান্ধব পরিবেশ আনার উদ্যোগ নিতে হবে পরিকল্পনাবিদদের।
সম্মিলিত পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের আয়োজিত এই নাগরিক সমাবেশে বক্তারা বলেন, র্যাম্প নির্মাণ উপলক্ষে প্রায় অর্ধশত গাছ কাটার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে যার মধ্যে বেশ অনেকগুলোই শতবর্ষী। এতে ন্যাচারাল হেরিটেজ সিআরবির দ্বিতল সড়কের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখোমুখি হয়েছে।
সিডিএ কর্তৃত র্যাম্প নির্মাণ ঘোষণা প্রদান ও উক্ত স্থানে গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই সম্মিলিত পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন চট্টগ্রাম এর প্রতিবাদে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। এই প্রতিবাদী কর্মসূচির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের সিভিল সোসাইটি, শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদগন।
 |
| পত্রিকা |
সম্মিলিত পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন, এই র্যাম্প নির্মাণ বন্ধে সিডিএ এর সুস্পষ্ট ঘোষণার দাবী ছাড়াও আরো বেশ কিছু দাবী ও কর্মপরিকল্পনা ঘোষণ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে, চট্টগ্রামে অবশিষ্ট জলাশয়, দীঘি, খাল ভরাট চলবে না; পাহাড় ও গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে; নদী দখল ও দূষণ বন্ধ করতে হবে, চট্টগ্রামের দখলকৃত খেলার মাঠসমূহ অবমুক্ত ও অবশিষ্ট খেলার মাঠগুলো উন্মুক্ত রাখতে হবে, চট্টগ্রাম শহরের সবুজ বেষ্টিত অঞ্চলকে গ্রীণ জোন ঘোষণা করতে হবে। এছাড়া সম্মিলিত পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন চট্টগ্রাম নগরের বেশ কিছু এলাকায় দেশজ পরিবেশ বান্ধব গাছ লাগানোরও নিয়মিত কর্মসূচিও অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
No comments