মানুষই পারে পৃথিবীতে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে
“এই মুহূর্তে পৃথিবীতে জীবিত এবং মৃত প্রতিটি জিনিসের ওপর আমাদের অর্থাৎ মানুষের যে নিয়ন্ত্রণ তা আগে কখনও কোনও প্রজাতির ছিল না। পছন্দ করি বা না করি— দারুণ এই দায়িত্ব আমাদের উপরেই বর্তেছে। আমাদের ভবিষ্যতই শুধু না, অন্য সব প্রাণ যাদের সঙ্গে এই ধরিত্রী ভাগাভাগি করে জীবনধারণ করি তাদের সবার দায়িত্ব এখন আমাদের হাতে।’’ ‘লাইফ অন আর্থ’ প্রামাণ্যচিত্রে ডেভিড এটেনবরো এভাবেই এই পৃথিবীকে বাঁচাতে মানুষের দায়িত্বের কথা বলেছেন।
প্রাণের বিচিত্র সম্ভারে ভরপুর আমাদের চারপাশের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে দ্রুত। নানান বর্ণ, আকার, আকৃতির জীববৈচিত্র্য প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে— সুস্থ রাখে প্রতিবেশ। মাটি, পানি, বাতাস সর্বত্র বৈচিত্র্যময় প্রাণ পারস্পরিক নির্ভরতায় বেঁচে থাকে এবং বাঁচিয়ে রাখে জীবন— একে অপরের উপর নির্ভর করে চক্রাকারে সচল থাকে জীববৈচিত্র্যের শিকল। এখন এই শিকল ছিড়ে যাচ্ছে, ভেঙে পড়ছে। যার দায় মানুষের এড়িয়ে যেতে পারে না।
এইতো সেদিন খবর এল, চট্টগ্রামের ‘রামগড়-সীতাকুণ্ড সংরক্ষিত বন’ কেটে রাস্তা বড় করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ বনে রয়েছে ২৫ ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১২৫ রকমের পাখি, আট প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২৫ প্রজাতির গাছের আবাস। এ প্রকল্পের কারণে চার হাজার মা গাছ কাটা হবে, কাটা হবে পাহাড় এবং মাটির উপরিভাগ বা টপসয়েল।
এর আগেও এ অঞ্চলে ‘ইপিজেড’-এর কারণে ধ্বংস হয়েছে বন— জীববৈচিত্র্য। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন করার সময়ও ধ্বংস হয়েছে প্রাকৃতিক বন ও জীববৈচিত্র্য। মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে এভাবেই এই গ্রহটাকে বাসের অযোগ্য করে তুলছে ক্রমশ। তাপমাত্রার পরিবর্তন, খাবারের অভাব, আবাসের অভাবে ক্ষুদ্র প্লাংকটন থেকে শুরু করে ভ্রমর, মৌমাছি, পাখি, বড় বড় হাতি এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে।
পৃথিবীর উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল এখন পরিবর্তনের এক বড় ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ক্রমশ তপ্ত হয়ে ওঠা ধরিত্রীর পরিবেশ অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণির জন্য বিপদজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, কেবল ষোড়শ শতাব্দীর পর থেকে প্রায় ৬৮০ প্রজাতির মেরুদণ্ডী প্রাণি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সংখ্যাটি আশঙ্কাজনক নয় কি! মানব ইতিহাসের আগের বিলুপ্তির হারের তুলনায় এটি এক হাজার গুণ বেশি।
এটা মোটেই এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপার নয়। ঘুম ভেঙে যে কাক, চড়ুইয়ের ডাক আগে শোনা যেত তা কিন্তু এখন কমে গেছে। এই কমে যাওয়া কখন নাই হয়ে যাবে চোখের পলকে— কেউ বুঝতেই পারবে না।
মহাবিলুপ্তির সময়কাল পার করছে এই গ্রহ। এখন পর্যন্ত পাঁচটি মহাবিলুপ্তি ঘটে গেছে এই পৃথিবীতে। এখন চলছে ষষ্ঠ বিলুপ্তির পর্যায়। এই পর্যায়ে এর মধ্যেই হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণি। যে কোনও প্রজাতির আয়ুষ্কাল এক মিলিয়ন থেকে ১০ মিলিয়ন বছর। কোনও প্রজাতির ৭৫ শতাংশ যদি এর ক্ষুদ্রতম সময়ের মধ্যে হারিয়ে যায় তবে তা বিলুপ্তির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ নিজেদের সম্পূর্ণ জীবনকালের অনেক আগেই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া প্রজাতির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যা অস্বাভাবিক।
এই মহাবিলুপ্তির পেছনে কাজ করছে অনেকগুলো ফ্যাক্টর— উষ্ণায়ন এদের মধ্যে অন্যতম। সর্বশেষ যে গণবিলুপ্তি সংঘটিত হয়েছিল, যার কারণে ডায়নোসর বিলুপ্ত হয়ে যায় পৃথিবী থেকে, তাও আজ থেকে ৬৬ মিলিয়ন বছর পূর্বে সংঘটিত হয়।
জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরির বৃহৎ বিস্ফোরণ, উল্কাপিন্ডের আঘাতের কারণে গণবিলুপ্তির শিকার হয়েছে বিভিন্ন সময়ে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল। বর্তমানে যে বিলুপ্তির পর্যায় চলমান তার জন্য মানব সৃষ্ট উষ্ণায়ন, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মানবজাতির বিবিধ কার্যকলাপ দায়ী।
যে হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে দ্বাবিংশ শতাব্দীতে যে তাপমাত্রা হবে, তাও গত পাঁচ মিলিয়ন শতাব্দীতে হয়নি। এই তাপমাত্রার জন্য যে পরিবর্তনগুলো হবে, তাতে করে প্রাণিকুলের টিকে থাকা কঠিন হবে।
বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের হারিয়ে যাওয়া এখন স্পষ্ট এবং দৃশ্যমান। শহরগুলো সবুজ হারিয়ে ইট-কাঠ-পাথরের ইমারতে শোভিত হচ্ছে— কংক্রিট দিয়ে মুড়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতি ইঞ্চি মাটি।
“এই মুহূর্তে পৃথিবীতে জীবিত এবং মৃত প্রতিটি জিনিসের ওপর আমাদের অর্থাৎ মানুষের যে নিয়ন্ত্রণ তা আগে কখনও কোনও প্রজাতির ছিল না। পছন্দ করি বা না করি— দারুণ এই দায়িত্ব আমাদের উপরেই বর্তেছে। আমাদের ভবিষ্যতই শুধু না, অন্য সব প্রাণ যাদের সঙ্গে এই ধরিত্রী ভাগাভাগি করে জীবনধারণ করি তাদের সবার দায়িত্ব এখন আমাদের হাতে।’’ ‘লাইফ অন আর্থ’ প্রামাণ্যচিত্রে ডেভিড এটেনবরো এভাবেই এই পৃথিবীকে বাঁচাতে মানুষের দায়িত্বের কথা বলেছেন।
খুব বেশি না, এক দশক আগেও দেখা মিলত ভোরের আলো ফোটার পর ঝিঙ্গা ফুলে কালো ভ্রমর উড়ছে। কিন্তু আমাদের পরিবেশে ভ্রমর, মৌমাছি, বোলতা, প্রজাপতির সংখ্যা কমছে আশঙ্কাজনকভাবে। অথচ তাদের ছাড়া চারপাশের প্রকৃতি চিন্তাই করা যায় না। পরাগের রেণু ফুলে ফুলে বয়ে নিয়ে পৃথিবীর খাদ্য ভান্ডার তৈরিতে তাদের যে ভূমিকা সেটা সবাই আমরা জানি। কিন্তু তারা যে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে সে খবর কয়জনইবা রাখি!
প্রাণের বিচিত্র সম্ভারে ভরপুর আমাদের চারপাশের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে দ্রুত। নানান বর্ণ, আকার, আকৃতির জীববৈচিত্র্য প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে— সুস্থ রাখে প্রতিবেশ। মাটি, পানি, বাতাস সর্বত্র বৈচিত্র্যময় প্রাণ পারস্পরিক নির্ভরতায় বেঁচে থাকে এবং বাঁচিয়ে রাখে জীবন— একে অপরের উপর নির্ভর করে চক্রাকারে সচল থাকে জীববৈচিত্র্যের শিকল। এখন এই শিকল ছিড়ে যাচ্ছে, ভেঙে পড়ছে। যার দায় মানুষের এড়িয়ে যেতে পারে না।
এইতো সেদিন খবর এল, চট্টগ্রামের ‘রামগড়-সীতাকুণ্ড সংরক্ষিত বন’ কেটে রাস্তা বড় করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ বনে রয়েছে ২৫ ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১২৫ রকমের পাখি, আট প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২৫ প্রজাতির গাছের আবাস। এ প্রকল্পের কারণে চার হাজার মা গাছ কাটা হবে, কাটা হবে পাহাড় এবং মাটির উপরিভাগ বা টপসয়েল।
এর আগেও এ অঞ্চলে ‘ইপিজেড’-এর কারণে ধ্বংস হয়েছে বন— জীববৈচিত্র্য। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন করার সময়ও ধ্বংস হয়েছে প্রাকৃতিক বন ও জীববৈচিত্র্য। মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে এভাবেই এই গ্রহটাকে বাসের অযোগ্য করে তুলছে ক্রমশ। তাপমাত্রার পরিবর্তন, খাবারের অভাব, আবাসের অভাবে ক্ষুদ্র প্লাংকটন থেকে শুরু করে ভ্রমর, মৌমাছি, পাখি, বড় বড় হাতি এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে।
পৃথিবীর উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল এখন পরিবর্তনের এক বড় ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ক্রমশ তপ্ত হয়ে ওঠা ধরিত্রীর পরিবেশ অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণির জন্য বিপদজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, কেবল ষোড়শ শতাব্দীর পর থেকে প্রায় ৬৮০ প্রজাতির মেরুদণ্ডী প্রাণি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সংখ্যাটি আশঙ্কাজনক নয় কি! মানব ইতিহাসের আগের বিলুপ্তির হারের তুলনায় এটি এক হাজার গুণ বেশি।
এটা মোটেই এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপার নয়। ঘুম ভেঙে যে কাক, চড়ুইয়ের ডাক আগে শোনা যেত তা কিন্তু এখন কমে গেছে। এই কমে যাওয়া কখন নাই হয়ে যাবে চোখের পলকে— কেউ বুঝতেই পারবে না।
মহাবিলুপ্তির সময়কাল পার করছে এই গ্রহ। এখন পর্যন্ত পাঁচটি মহাবিলুপ্তি ঘটে গেছে এই পৃথিবীতে। এখন চলছে ষষ্ঠ বিলুপ্তির পর্যায়। এই পর্যায়ে এর মধ্যেই হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণি। যে কোনও প্রজাতির আয়ুষ্কাল এক মিলিয়ন থেকে ১০ মিলিয়ন বছর। কোনও প্রজাতির ৭৫ শতাংশ যদি এর ক্ষুদ্রতম সময়ের মধ্যে হারিয়ে যায় তবে তা বিলুপ্তির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ নিজেদের সম্পূর্ণ জীবনকালের অনেক আগেই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া প্রজাতির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যা অস্বাভাবিক।
যে হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে দ্বাবিংশ শতাব্দীতে যে তাপমাত্রা হবে, তাও গত পাঁচ মিলিয়ন শতাব্দীতে হয়নি। এই তাপমাত্রার জন্য যে পরিবর্তনগুলো হবে, তাতে করে প্রাণিকুলের টিকে থাকা কঠিন হবে।
বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের হারিয়ে যাওয়া এখন স্পষ্ট এবং দৃশ্যমান। শহরগুলো সবুজ হারিয়ে ইট-কাঠ-পাথরের ইমারতে শোভিত হচ্ছে— কংক্রিট দিয়ে মুড়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতি ইঞ্চি মাটি।
চট্টগ্রামের ‘রামগড়-সীতাকুণ্ড সংরক্ষিত বন’ কেটে রাস্তা বড় করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ বনে রয়েছে ২৫ ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১২৫ রকমের পাখি, আট প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২৫ প্রজাতির গাছের আবাস। এ প্রকল্পের কারণে চার হাজার মা গাছ কাটা হবে, কাটা হবে পাহাড় এবং মাটির উপরিভাগ বা টপসয়েল।
চট্টগ্রাম শহরে একটা রাস্তায় প্রায় শতবর্ষী অনেকগুলো গাছ বাঁচিয়ে রাস্তা বড় করেছিল সিটি করপোরেশন। সেখানে থাকা বট, নিম, স্বর্ণচূড়া, বেল, ডুমুর, কড়ই, আম, কদম গাছের গোড়াগুলো মুড়ে দেওয়া হয়েছিল কংক্রিট দিয়ে। যার ফলে গাছগুলো দুর্বল হয়ে মারা যাচ্ছিল। এখন এই গাছগুলোকে কংক্রিট মুক্ত করে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে।
এভাবেই আমরা জেনে ও না জেনেও ক্ষতি করছি চারপাশের। উপরিতলের চোখ ধাঁধানো উন্নয়নে প্রকৃতি হয়ে পড়ছে ক্রমশ শ্বাসরুদ্ধ। পাহাড় কেটে আবাসন, পথ-ঘাট তৈরি হচ্ছে অথচ এই পাহাড় যে সৃষ্টি করা সম্ভব না— প্রকৃতির অমূল্য দান তাবোঝার কেউ নেই। ১৬টি পাহাড় কেটে ছয় কিলোমিটার একটি রাস্তা তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম শহরে। এর ফলে একদম ধ্বংস হয়ে গেছে পাহাড়গুলো— নষ্ট হয়েছে জীববৈচিত্র্য।
খাদ্যাভাব, বাসস্থানের অভাব, বিষাক্ত পরিবেশ, দূষিত মাটি-পানি-বায়ু সকল প্রজাতির জীবের প্রাণ সংশয়ে ফেলেছে। বিশ্বজুড়ে চলছে এই হারিয়ে যাওয়া। জোনাকি পোকার শেষ কবে দেখা মিলেছে কে বলতে পারে! যদিও জোনাকি সুস্থ পরিবেশের নির্ণায়ক। নদী-খাল-বিল-হাওরে যে মাছ পাওয়া যেত— এখন এগুলো দুর্লভ হয়ে উঠেছে। অবিবেচকের মতো ভূমির ব্যবহার, ব্যাপক বৃক্ষনিধন, মানুষের অসচেতনতা— জীববৈচিত্র্য বিনাশের অন্যতম কারণ।
জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণির বিলুপ্তির আংশিক কারণ হলেও সবগুলো প্রভাবক একসঙ্গে কাজ করায় বিলুপ্তির গতি দ্রুতই ত্বরান্বিত হচ্ছে। ২১০০ সাল নাগাদ এক মিলিয়ন প্রজাতি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
এর মধ্যে রয়েছে মেরু অঞ্চলের ভালুক। উষ্ণায়নের ফলে মেরু অঞ্চলে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তাতে এই প্রাণিটির বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। খাদ্যাভাবে মেরু ভালুকেরা নারী এবং শিশু ভালুকদের মেরে খেয়ে ফেলছে। মেরু ভালুকদের টিকে থাকার লড়াই এখন চরম পর্যায়ে। এই বিলুপ্তি স্পষ্ট; চোখের সামনে— অলক্ষ্যে ঘটে যাচ্ছে এমন অনেক পরিবর্তন।
সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রকার মাছ, অন্যান্য জলজ প্রাণি এবং উদ্ভিদসমূহের বিপদের আশঙ্কাও করেছেন বিজ্ঞানীরা। এতে অভিযোজনে ব্যর্থ হয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে অনেক প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণি। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণেও পরিবর্তন ঘটছে উদ্ভিদ এবং প্রাণির জীবনে। সেখানেও চলছে অভিযোজন এবং অভিযোজনে ব্যর্থ হয়ে বিলুপ্ত হওয়ার ঘটনা।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণের যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সেটি ২০৩০ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০৫০ সাল নির্ধারণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। যদিও তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে বেড়েই চলেছে। এতে বাড়ছে গ্রীষ্মকালের দৈর্ঘ্য, অসময়ে বর্ষা, অতিবর্ষণ, খরা আর ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সব মিলিয়ে ঋতু বৈচিত্র্য হারিয়ে দিশেহারা হয়ে গেছে প্রাণপ্রকৃতি।
এর ফলে প্রকৃতিও তার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করছে। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অভিযোজনের মাধ্যমে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে ধীরে ধীরে বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে ফেলছে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণি। এবার শীতে বিভিন্ন এলাকায় ফুটেছে কদম ফুল। হেমন্তের ছাতিমকে ফুটতে দেখা গেছে বর্ষায়।
অভিযোজন চলছে প্রকৃতিতে, তাই এমন এলোমেলো অবস্থা। যারা টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাবে তারা হারিয়ে যাবে চিরতরে। এই হারিয়ে যাওয়া বা বিলুপ্তি শুরু হয়ে গেছে নীরবে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রত্যক্ষভাবে কোনও প্রাণির ওপর প্রভাব ফেললে তা ধীরে ধীরে বাস্তুতন্ত্রের অন্যান্য প্রাণির উপরেও প্রভাব ফেলে। তাপমাত্রার দ্রুত বৃদ্ধির ফলে ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফগুলো বিলুপ্ত হতে শুরু করেছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক উপদেষ্টা প্যানেল সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি বৃদ্ধি হলে সমুদ্রের অগভীর অংশের ৯০ ভাগ কোরাল রিফ ধ্বংস হবে। দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি হলে সব কোরাল মারা যাবে। এর মধ্যেই তাপমাত্রা বেড়ে গেছে এক ডিগ্রি।
বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়েও দ্রুততম সময়ে বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ছে। আমাজনের মতো বৃহত্তম রেইন ফরেস্টে এর প্রভাব অত্যন্ত দ্রুততর হচ্ছে। বর্ধিত তাপমাত্রায় এর ৩৫ শতাংশ ভেঙে পড়বে খুব দ্রুত।
মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাহিদা বৃদ্ধি এবং গ্রিন হাউস গ্যাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ ও বিশুদ্ধ পানির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবাগুলো নিশ্চিত করতে বাস্তুতন্ত্র ও ভূমির ওপর চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তন যুক্ত হয়ে বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ছে দ্রুত।
২০টির বেশি বাস্তুতন্ত্রের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, এদের বেশিরভাগই ‘টিপিং পয়েন্ট’ অতিক্রম করেছে। তারা আর চাপ নিতে পারছে না এবং শিগগিরই ভেঙে পড়বে— ফিডব্যাক লুপে পড়ে প্রভাবিত করবে অন্য সব বাস্তুতন্ত্রকে।
এদিকে কাক, দোয়েল, চড়ুইসহ নগরের অতি পরিচিত পাখিগুলো কমে গেছে আশংকাজনক হারে। তাদেরও বিলুপ্তির খাতায় নাম লেখাতে হবে নিকট ভবিষ্যতে।
প্রজাপতি, ফড়িং, বোলতা, মৌমাছির দেখাও মেলে না, দেখা মেলে না ঝিঁ ঝিঁ পোকা কিংবা ব্যাঙের। জোনাকি আর সুখে ডানা দুটোও মেলে না। নদী দূষণ, আলো দূষণে জোনাকির মায়া মায়া আলো পরের প্রজন্ম আর দেখবে না। খাদ্য শৃঙ্খলে শামুকের ওপর নির্ভরশীল জোনাকিরা শামুকের সঙ্গে সঙ্গে রূপকথার রাজ্যে বসত গড়তে শুরু করেছে। তাদের ফিরিয়ে আনতে জাপানে রীতিমতো কোর্স চালু করা হয়েছে।

No comments