সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের গুরুত্ব।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের গুরুত্ব
![]() |
বক্তব্য রাখছেন: ছাত্রলীগ নেতা ও সদস্য বাংলা প্রচলন উদ্যোগ-চট্টগ্রাম |
চলছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। যে ভাষার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে বাঙালিকে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে আনা হয়েছিল একটি ভাষা, যার নাম বাংলা ভাষা। পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই একমাত্র ঘটনা যে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য এত মানুষ প্রাণ দিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা মাতৃভাষার চেতনায় উজ্জীবিত হই। বাকি এগারো মাস ঘুম পাড়িয়ে রাখি মাতৃভাষার চেতনাকে। ভুলে যাই আমরা আমাদের অতীতের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্মৃতিকে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতিকে ঐক্যের নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল। কারণ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কারণেই সেদিন মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। জাতি আজও ভাষার জন্য আত্মদানকারীদের ভুলতে পারেনি। পৃথিবীর আর কোনো ভাষার জন্য কোথাও কেউ জীবন দেয়নি, ভাষার দাবিতে মরণপণ সংগ্রামও কোথাও হয়নি। তাই, আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা, প্রিয় বাংলা ভাষাকে নিয়ে আমাদের ভালোবাসা ও গর্ব অনেক বেশি।
বাংলাদেশ এ মাসে ভাষার প্রতি ভালোবাসার যে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তাই এই মাসকে নিয়ে বাঙালি বাংলাদেশিরা দেশ-বিদেশে অত্যধিক গর্ববোধ করে থাকে। এটা তাদের অধিকারও বটে। সেই অধিকারকে সম্মান দেখিয়েই জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেসকো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর, ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বর্তমানে বিশ্বের ১৮৮ দেশে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়, যা পৃথিবীর ২৫ কোটি বাংলাভাষী মানুষের জন্য অপরিমেয় এক আনন্দ ও গৌরবের বিষয়।
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, আমি ঘোষণা করছি আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা পায় বাংলা। সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে লেখা হয়, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিলেও সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার খুব একটা লক্ষ করা যায় না। ফলে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭’ প্রণয়ন করা হয়। ওই আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিত হইবে। এই ধারা মোতাবেক কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।’
এই আইনটিও ব্যর্থ হলে ১৯৯৮ সালের শেষদিকে ‘বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ’ গঠন করা হয়। এর কর্মপরিধির মধ্যে অন্যতম ছিল ব্রিটিশ আমল থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও আদালতের প্রযোজ্য ইংরেজিতে প্রণীত আইন বাংলা ভাষায় রূপান্তর করা। এ কার্যক্রমটি কিছুদিন জোরেশোরে চললেও একসময় তা গতি হারিয়ে ফেলে। আজ এর অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। আইন করার পরও সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন করা যায়নি। উচ্চ আদালতেও পুরোপুরি বাংলা চালু হয়নি। সেখানে আইনি পরিভাষার অভাবের কথা বলা হয়। কিন্তু কয়েকজন বিচারপতি বাংলা ভাষায় রায় দিয়ে প্রমাণ করেছেন সদিচ্ছা থাকলে বাংলা ভাষায় রায় দেওয়া যায়।
‘নানান দেশের নানান ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা’ রামনিধি গুপ্তের এই কবিতাংশ কেবল আমাদের নয়, বিশ্বের প্রতিটি মাতৃভাষী মানুষের কাছেই ধ্রুব সত্য। নিজেদের ভাষায় কথা বলার পাশাপাশি প্রচলিত আর দাপ্তরিক ভাষায়ও আমরা কথা বলি, বিভিন্ন কাজ করি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাষাগুলোর মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা অন্যরকম।
আজ এত বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে বারবার। চারদিকে আজ পশ্চিমা এবং হিন্দি ভাষার আগ্রাসনের ছড়াছড়ি। তরুণসমাজ পশ্চিমা অশ্লীল সংস্কৃতিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। যে রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার করার কথা ছিল, সেখানে আজ সিংহভাগ ব্যবহার করা হচ্ছে ইংরেজি ভাষা। এমনকি বাংলাকে ইংরেজি এবং হিন্দির সঙ্গে মিশিয়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন ও ব্যবহারে যে স্বপ্ন নিয়ে রক্ত দিয়েছিলেন বাংলার দামাল ছেলেরা, তাদের সে স্বপ্ন যেন আজ ক্রমেই ফ্যাকাশে হতে শুরু করেছে। ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আইন-আদালত, গণমাধ্যমসহ সর্বত্রই উপেক্ষিত বাংলা। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষত উচ্চশিক্ষায় বাংলা ব্যবহার নেই বললেই চলে। অথচ ভাষাগত দিক থেকে বাংলা যথেষ্ট সমৃদ্ধিশালী। তথাপি বাংলা যেন নিজভূমে পরবাসী।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিভিন্ন সাইন বোর্ডগুলো লেখা হয় ইংরেজিতে, আবার বিয়ে ও জন্মদিনের কার্ডগুলো বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে লেখা হয়। বানানের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত প্রমিত বাংলা নিয়ম একেবারেই মানা হয় না। আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও জটিলতা রয়ে গেছে। যেখানে আমরা বাংলার প্রচলন করতে পারিনি। রাষ্ট্রের একটা ভাষানীতি এবং ভাষা-পরিকল্পনা থাকা দরকার। আর তা দরকার একটা ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আজকাল অনেক চাকরির পরীক্ষায়ই বাংলাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়েছে। সরকারি নোটিস, বিজ্ঞাপন ও প্রজ্ঞাপনে বাংলা ভাষার শব্দ ইংরেজি হরফে লেখা হচ্ছে। দেশের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের নাম, গণমাধ্যমের নাম, সাইন বোর্ড, ব্যানার ইংরেজিতে লেখা হচ্ছেÑ সেসব না হয় বাদই দিলাম।
আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার প্রয়োজন ও গুরুত্ব নিশ্চয়ই আছে কিন্তু তার মানে এই নয় যে, মাতৃভাষা উপেক্ষা করে সেই প্রয়োজনটা দেখাতে হবে। চীন-জাপান-কিউবাসহ অনেক দেশ ইংরেজিকে থোড়াই কেয়ার করে দিব্যি তাদের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রেখেছে। তাহলে আমাদের কেন মাতৃভাষার প্রতি এতটা অবহেলা? কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, ‘আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি, তারপর বিদেশি ভাষার পত্তন।’ মাতৃভাষাটা ভালোভাবে রপ্ত করেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত বহু ভাষাবিদ প-িত হয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও বিশ^দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
এই প্রতিযোগিতার বাজারে ইংরেজির কোনো বিকল্প নেই। এই কথাটি যেমন সত্য, তেমনি মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নিস্তার থাকলেও বিবেকের দংশন থেকে আমাদের মুক্তি নেই। যাহোক, ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা একটু বেশিমাত্রায় বাঙালিয়ানা শুরু করি। ষোলোআনা বাঙালি সাজতে প্রাণন্তর চেষ্টা করি। আমাদের অন্তরে যতটা না বাঙালি চেতনা ও অস্তিত্ব বোধ আছে, তার চেয়েও বেশি মাত্রায় কিছু করার চেষ্টা আমাদের অব্যাহত থাকে।
![]() |
| সসর্বস্তরের বাংলা প্রচলন উদ্যোগ-চট্টগ্রাম |
যে মাতৃভাষা বাংলাকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে গিয়ে এ জাতির বীর সন্তানরা তাদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছিল, সে মাতৃভাষা বাংলাকে এভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা মেনে নেওয়া যায় না। তাই আসুন, বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে সবাই মিলে কাজ করি।
-1.jpg)

No comments